নামাজে কোরআন মাজীদ দেখে পড়া নিয়ে মিজানুর রহমান আজহারী সাহেবের ভূল বক্তব্যের দলিল ভিত্তিক জবাব

April 25, 2020.          1878

# হযরত মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক ।
মিজানুর রহমান আজহারী নামের একজন সাড়া জাগানো তরুণ বক্তা বেশ কিছু গলত মাসআলা জনসম্মুখে প্রচার করে। যার কারণে দেশের হক্কানী ওলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকে তার এসব বিতর্কিত সালাত ভাঙ্গা জবাব দেয়া হয় বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন সেখান থেকেও তিনি বিভিন্ন বিতর্কিত মাসআলা দিয়ে যাচ্ছেন। গতকাল তিনি রমজান উপলক্ষে তার দেয়া লাইভ বক্তব্যে সুন্নাত ও নফল নামাজে কোরআন শরীফ দেখে দেখে পড়া জায়েজ সংক্রান্ত একটি ভুল মাসআলা পেশ করেন। মুসলিম উম্মাহ কে তার এই ভুল মাসালা থেকে বিরত রাখার লক্ষ্যে আমরা এ সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা করলাম।
(১) ইমাম আযম আবু হানিফা রাহ. এর মতে নামাযের মধ্যে দেখে দেখে কিরাত পড়লে নামায নষ্ট হয়ে যায়। পরিমাণে অল্প হোক বা বেশি, চাই একাকী নামাজ পড়ুক বা ইমাম হয়ে নামাজ পড়ুক। সর্বাবস্থায় কিরাত দেখে দেখে পড়লে নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে। (তাবয়ীনুল হাকায়েক, ১/১৫৮)
ইমাম আবু হানিফা রহ. এর মতের সাপেক্ষে দুটি কারণ উল্লেখ করেন
(ক) কুর’আন শরীফ দেখে পড়ার জন্যে মাসহাফ হাতে ধরতে হয়, পৃষ্ঠা পরিবর্তন করতে হয়। যা আমলে কাছীর হওয়া স্পষ্ট আর আমলে কাছীর নামায ভঙ্গের কারণ।
(খ) নামাযের মধ্যে মাসহাফ দেখে পড়া অন্যের থেকে কুর’আন শরীফ শিখে নিয়ে পড়ার সাদৃশ্য। আর নামায অবস্থায় অন্যের থেকে শিখে তিলাওয়াত করাও নামায ভঙ্গের কারণ। ইমাম আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনে ফজল রহ. বলেন, যদি এমন হয় যে, কেউ মাসহাফ দেখে কুর’আন পড়তে পারে কিন্তু মুখস্ত পড়তে পারে না। এই ব্যক্তির জন্যে বিধান হল সে, কিরাত বিহীন নামায পড়বে। যদি নামাজে দেখে পড়ার অনুমতি থাকত তবে এমন ব্যক্তির জন্যে কিরাতবিহীন নামাজের অনুমতি দেওয়া হত না। ( আল মুহীতুল বুরহানী, ১/৩১১) আল বাহরুর রায়েক, ২/১১)
ইমাম আবূ হানীফা রাহ. এর মতের পক্ষে হাদীস ও আছারসমূহঃ
১। নামায অবস্থায় মাসহাফ ধারণ করে কিরাত পড়া রাসূলুল্লাহ সা. এর আদেশ থেকে দূরে সরে যাওয়া। কারণ রাসূল সা. বলেছেন, তোমরা সেভাবেই নামায পড় যেভাবে আমাকে নামায পড়তে দেখেছ। (বুখারী শরীফ হাঃ নঃ ৬০০৮)
নামায চলাকালীন অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সা. এর আমল সম্পর্কে সাইয়্যদুনা ওয়াইল ইবনে হুজর রা. বর্ণনা করেন, “অতঃপর তিনি নিজের ডান হাতকে বাম হাতের উপর রাখলেন। (মুসলিম শরীফ, হাঃ নঃ ৪০১)
এই বিধান বর্ণনা করার সময় সাহল ইবনে সাদ ইবনে মালেক রা. বলেন, “লোকদেরকে আদেশ দেওয়া হত যেন তারা নামাযে দাঁড়ানোর সময় ডান হাতকে বাম হাতের উপর রাখে। ( বুখারী শরীফ, হাঃ নঃ ৭৪০)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হুকুম নামাযে দাঁড়ানো অবস্থায় স্পষ্ট। এখন যদি কেউ মোবাইলে বা মাসহাফে দেখে দেখে কিরাত পড়ে তাহলে লম্বা এক সময় তাকে একহাতে মাসহাফ বা মোবাইল ধারণ করে রাখতে হবে। যা রাসূলুল্লাহ সা. এর আদেশ ও আমলের বিপরীত। উপরোন্তু এটা আমলে কাছীর।
২। আম্মাজান আয়েশা সিদ্দীকা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা.কে নামাযে এদিক ওদিক তাকানোর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এটা একটা বিঘ্নতা। এর দ্বারা শয়তান বান্দাদেরকে নামাযে বিঘ্নতা ঘটিয়ে থাকে। ( বুখারী শরীফ, হাদীস নং ৭৫১ )
এ হাদীসে নামাযে এদিক ওদিক তাকানো থেকে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু নামাযে মাসহাফ বা মোবাইল দেখে দেখে কিরাত পড়ার কারণে দীর্ঘক্ষণ এদিক ওদিক তাকাতে হয়। যা সম্পূর্ণভাবে নিষেধ।
৩। রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, নামায অবস্থায় আমার নিকটে ঐ ব্যক্তিরা দাঁড়াবে যারা বুঝমান ও ইলমের অধিকারী। ( মুসলিম শরীফ, হাদীস নং ৪৩২২)
যদি নামাযে কুর’আন মাজীদ দেখে পড়ার অনুমতি থাকত তবে এই হাদীসে কোন উদ্দেশ্য থাকে না। কেননা এই হাদীস উদ্দেশ্য হল, ইমামের কাছাকাছি যারা দাঁড়াবে তারা যেন কুর’আন জাননেওয়ালা হয়। যদি ইমাম কোন ভুল করে তাহলে যেন লোকমা দিতে পারে। এখন নামাযে যদি দেখে পড়ার অনুমতিই থাকে তবে এ হাদীসের কী মতলব?
৪। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমরা আমার ও আমার খোলাফায়ে রাশেদীনের নিয়মনীতিকে আবশ্যক করে নাও।” ( আবূ দাউদ, হাঃ নঃ ৪)
রাসূল সা. ও চার খলিফার স্বর্ণযুগে এমন কোন দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না যার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সাহাবায়ে কেরামের কেউ নামাযে মাসহাফ ধারণ করে দেখে দেখে তিলাওয়াত করেছেন। বরং অনেক সাহাবা থেকে নামাযে দেখে দেখে কিরাত পড়ার ব্যাপারে নিষেধ এর বর্ণনা পাওয়া যায়। যার বর্ণনা আসছে ইনশাআল্লাহ!
৫। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ” আমিরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রা. আমদেরকে কুরআন দেখে দেখে ইমামতি করতে নিষেধ করেছেন এবং আরো নিষেধ করেছেন যেন, বালেগ না হয়ে ইমামতি না করে।” ( কিতাবুল মাসাহিফ- ১৮৯ পৃষ্ঠা )
৬। ইমাম ক্বাতাদা রাহ. সাঈদ ইবনুল মুসায়িব রা. থেকে বর্ণনা করেন যে, যদি তাহাজ্জুদ নামাযে পড়ার জন্যে কারো স্মরণে সামান্যতম আয়াত মুখস্ত থাকে তবে তাই বারংবার পড়বে। তবুও নামাযে কুর’আন দেখে দেখে পড়বে না। ( প্রাগুক্ত)
৭। ইমাম লাইস রহ. হযরত মুজাহিদ রাহ. থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি কুর’আন দেখে দেখে নামায পড়াকে মাকরুহ বলেছেন। কারণ এতে আহলে কিতাবের সাথে সাদৃশ্য হয়ে যায়। এরূপ আরও বর্ণনা পাওয়া যায় ইমাম ইবরাহীম রাহ. থেকে।
( বিস্তারিত দেখুন, কিতাবুল মাসাহিফ লিল ইমাম আবি দাউদ, ১৮৯, ১৯০, ১৯১ পৃষ্ঠা)
৮। খতীবে বাগদাদী রাহ. তার ইতিহাস গ্রন্থে হযরত আম্মার ইবন ইয়াসার রাজি. এর আছর বর্ণনা করেন যে, তিনি এই বিষয়টা অপছন্দ করতেন যে, কোন ব্যক্তি রমজান মাসে তারাবীহ পড়াবে আর কুর’আন দেখে দেখে পড়বে। কেননা এটি আহলে কিতাবের আমল। দেখুনঃ তারীখে বাগদাদ ৯/১২০
৯। সাইয়েদুনা সুয়াইদ ইবনে হানজালা রাজি. এক গোত্রের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। যাদেরকে এক লোক কুর’আন শরীফ দেখে দেখে নামায পড়াচ্ছিলেন। এটা তিনি অপছন্দ করলেন এবং মাসহাফকে দূরে সরিয়ে দিলেন। এটা রমজান মাসের ঘটনা ছিল। ( মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা, ২/১২৪, মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, ২/৪১৯)
১০। আল্লামা ফুজায়েল ইবনে আয়াজ রাহ. বলেন, হাফেজে কুর’আনরা মূলত ইসলামের ঝাণ্ডাবাহী।” (আত তিবইয়ান, ৫৫ পৃষ্ঠা)
একথার দ্বারা অনুমান করা যায় কুর’আন হিফজের মর্তবা কত বুলন্দ। যদি হিফজুল কুর’আন এর মধ্যে কমতি হতে থাকে তবে দ্বীনে গুরুত্বপূর্ণ কাজে কমতি পরিলক্ষিত হবে। যদি নামাযে দেখে দেখে কুর’আন পড়ার অনুমতি থাকে তবে রামযানে হাফেজগণ মুখস্থ পড়ার প্রতি উৎসাহিত থাকবে না। মানুষের মাঝে কুর’আন হিফজের ব্যাপারে অলসতা দেখা দিবে। এভাবে একসময় নাউযুবিল্লাহ মানুষের অন্তর থেকে কুর’আন মুছে যেতেও বেশি সময় লাগবে না।
অন্যান্য ইমামের মত
(২) ইমাম আবূ ইউসুফ রহ. ও ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এর নিকট যদি ইয়াহুদ বা নাসারাদের সাদৃশ্যতা উদ্দেশ্য হয় তবে মাকরুহ। অন্যথা মাকরুহ নয়। আল্লামা নববী রহ. বলেন, নামাযে কুর’আন দেখে পড়লে নামায নষ্ট হয় না। এটি আমাদের মত ও ইমাম আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ, মালেক ও ইমাম আহমাদ রহ. এরও মত। (দেখুন আলমাজমু’ ৪খণ্ড ২৭ পৃষ্ঠা)
(৩) ইমাম মালেক রহ. এর ভিন্ন মতে ফরজ নামাযে মাকরুহ। চাই কিরাত নামাযের শুরু থেকেই দেখে বলুক বা নামাজের মাঝে গিয়ে দেখে বলুক। তবে নফল নামাজে শুরু থেকেই কিরাত দেখে পড়ে তবে মাকরুহ নয়। কিন্তু মাঝখানে গিয়ে দেখে পড়া মাকরুহ। (মানহুল জালীল, ১ খণ্ড, ৩৪৫ পৃষ্ঠা)
(৪) ইমাম শাফেয়ী ও আহমদ ইবন হাম্বল রাহ. এর নিকট সর্বক্ষেত্রে জায়েয। আল্লামা নববী রহ. বলেন, যদি কারো সূরায়ে ফাতেহা হিফজ না থাকে তবে নামাযে দেখে পড়া ওয়াজিব। এজন্যে মাসহাফ ধারণ করা বা কখনো পৃষ্ঠা পরিবর্তন করলেও নামায ভঙ্গ হবে না। (আল মাজমু’ ৪/৯৫)
অন্যান্য ইমামের মতের পক্ষে দলীল ও তার জবাবঃ
১ম দলীলঃ নামাযের দেখে দেখে কুর’আন তিলাওয়াত করা জায়েয প্রবক্তাদের সর্বপ্রথম দলীল হল, আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা রাজি. এর হাদীস। রমাজানে তারাবীহের নামাযের ইমামতিতে তারঁ গোলাম যাকওয়ান দেখে দেখে কুর’আন তিলাওয়াত করতেন। হাদীসটি বুখারী শরীফে বাবু ইমামাতিল আবদে উল্লেখ আছে। জায়েয প্রবক্তারা এই হাদীস দ্বারা নামাজে মাসহাফ ধারণ করে দেখে দেখে কুর’আন পড়ার বিধান প্রমাণ করতে চান। এ হাদীসের জবাব কয়েকভাবে দেওয়া হয়।
১. এই হাদীসে কুরআনের মাসহাফ বা ভলিয়ম হাতে ধরার কথায় উল্লেখ নেই। সুতরাং এই হাদীস দ্বারা হাতে ধারণ করে কুর’আন শরীফ দেখে পড়া প্রমাণ হয় না। কেউ যদি বলে যে, হয়ত ধারণ করেই পড়তেন। সম্ভাবনা তো থেকেই যায়। এর উত্তরে বলে হবে, সে যুগে কুর’আন এর জিলদ এত ছোট ছিল না হাতে রেখে তিলাওয়াত করা সম্ভব হবে। কেননা সে যুগে ঐ ছয় মাসহাফ যেগুলো হযরত উসমান রাজি. লিখিয়ে সব মানুষকে এক কিরাতে উপর একত্রিত করেছিলেন তার একখানা মাসহাফকে মাকাতাবায়ে মারকাযিয়্যাহ ইসলামিয়া মিশর সফটওয়ার সংস্কার করে। ৭৫*৬৭ সাইজের ১০৮৭ পৃষ্ঠা সংবলিত ভলিউমের ওজন দাঁড়ায় ৮০ কেজি! এত ভারী জিলদ হাতে নিয়ে নামাযে দেখে দেখে পড়ার কথা কল্পনাও করা যায় না।
২. বুখারী শরীফের রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে ” وَکَانَتْ عَائِشَةُ یَوٴُمُّہَا عَبْدُہَا ذَکوَانُ مِنَ الْمُصْحَفِ ” আয়েশা রা. এর গোলাম তার তারাবীহের নামাজ পড়াতেন মাসহাফ থেকে দেখে দেখে।”
আর এই হাদীসটা মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাতে উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে, ” کَانَ یَوٴُمُّ عَائِشَةَ عَبْدٌ یَقْرَأُ فِي الْمُصْحَفِ অর্থাৎ আয়েশা রাজি. এর ইমামতি করতেন এক গোলাম যে মাসহাফে দেখে কুরআন পড়তেন। ( মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ৭২৯৩)
এ হাদীসের ব্যাখ্যায় নাসিরুদ্দিন আলবানী রহ. বলেন, উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দীকার ইমামতির যে ঘটনা বর্ণিত আছে সেটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। ব্যাপক কোন ঘটনা নয়। ( ফাতহুর রাহমান, ১২৪ পৃষ্ঠা)
৩. আল্লামা কাসানী রহ. লেখেন, এটাও সম্ভব যে, যাকওয়ানের কুর’আন দেখে পড়ার বিষয়ে আয়েশা সিদ্দীকা রা. অজ্ঞ ছিলেন। কেননা নামাযে দেখে কুর’আন পড়া তৎকালীন উলামায়ে কেরামের ঐক্যমতে মাকরুহ। যদি তিনি জানতেন তবে বিনা কারণে পুরো মাস এই মাকরুহ কাজে লিপ্ত থাকার সুযোগ দিতেন না। অথবা এই সম্ভাবনাও বিদ্যমান যে, যাকওয়ানে অবস্থা দু ভাগে বিভক্ত। এক. তিনি তারাবীহের ইমামতি করতেন। দুই.বাকি অন্যসময় মাসহাফে দেখে দেখে কুর’আন পড়তেন। ( দেখুনঃ বাদায়েউস সানায়ে’ ২য় খণ্ড ১৩৩/১৩৪ পৃষ্ঠা)
৪. আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রাহ. বলেন, যাকওয়ানে হাদীসের দ্বারা উদ্দেশ্যে হল, যাকওয়ান নামায শুরু করার পূর্বে কুর’আন দেখে আত্মস্থ করে নিতেন এবং নামাযে গিয়ে তা তিলাওয়াত করতেন। তিনি প্রতি দুই রাকাতে কী তিলাওয়াত করবেন তা নামাযের আগে মাসহাফ খুলে পোক্তা ইয়াদ করে নিতেন। রাবী এটাকেই বর্ণনার করতে গিয়ে বলেছেন যে, কুর’আন দেখে তিলাওয়াত করতেন। ( বিনায়া, ২/৫০৪)
আল্লামা আইনী ও কাসানীর এই অভিমতের পক্ষে নায়লুল আওতার নামক গ্রন্থে ইমাম শাওকানী রাহ উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. এর নামাজে তারাবীহের হাদীস উল্লেখ করেন কিন্তু সেখানে কুর’আন দেখে পড়া বা মুখস্থ পড়ার কোন আলোচনা উল্লেখ করেননি। ইমাম ইমাম হাজর আসকালানীও একই রকম রিওয়ায়েত নকল করেন। (দেখুন- নায়লুল আওতার, ৫৮৭, বাবু ইমামাতিল আবদ, আত্ব তালখীস, ২/১১০)
৫. যাকওয়ানের হাদীসে দুটি সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছিল। এক হল মাসহাফ দেখে পড়া, যা বাতিল সাব্যস্ত হয়েছে। দ্বিতীয় হল, মাসহাফ হাতে ধারণ না করে দেখে দেখে পড়া। তৎকালীন সময়ে কোথাও কোথাও মাসহাফকে সামনে বা ডানে কোন কিছুর উপর রেখে দেওয়া হত। তারপর নামাযের মধ্যে কখনো কখনো সেখান থেকে দেখে পড়ত। তবে এই সম্ভাবনাকেও বাতিল বলা হবে নামাযে রাসূলুল্লাহ সা. এর আদেশ কোন দিকে না তাকিয়ে একাগ্রতার সাথে নামাযের হাদিস দ্বারা।
২য় দলীলঃ আবূ আইয়ুব সাখতিয়ানী, হাসান আল বাসরী উভয়েই ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন রহ. থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি নামাযে কুর’আন দেখে পড়াকে জায়েয মনে করতেন। এই রেওয়ায়েতর উত্তর আগের মতই। প্রথমত এই রেওয়ায়েত দ্বারা নামাযে কুর’আন হাতে রেখে দেখে দেখে পড়ার কথা উল্লেখ নেই। দ্বিতীয়ত নামাযে দেখে দেখে কুর’আন পড়ার যতগুলো রিওয়ায়াত বর্ণনা পাওয়া যায় সেগুলোর প্রায় সকল ইবারতে ইদরাজ খুঁজে পাওয়া যায়। রিওয়ায়েতগুলোর ভিন্ন ইবারতের প্রতি লক্ষ করলে দেখা যায় নামাযে দেখে কিরাত পড়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে অনোন্যপায় অবস্থায় বিশেষ অপারগতা কারণে। যেমন ইমাম আহমদ রাহ. কে এই সম্পর্কে জিজ্ঞাস করা হলে তিনি বলেন, আমি এটাকে উপযোগী মনে করি না। তবে অনোন্যপায় হলে ভিন্ন কথা।” ( ফাতহুর রাহমান, ১২৭ পৃষ্ঠা)
ইবনে ওয়াহাব রাহ. বলেন, আমি ইমাম মালেক রাহ. থেকে শুনেছি, তাকে রমজানে তারাবীহের নামাযে কুর’আন দেখে দেখে পড়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, যদি দেখে পড়া ছাড়া না চলে তবে দেখে পড়তে অসুবিধে নেই। ( কিতাবুল মাসাহেফ, ১৯৩)
কাতাদা রাহ. সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন যদি মুখস্থ পড়ার মত কিছুই না থাকে তাহলে অনোন্যপায় হয়ে দেখে পড়তে পারেন। (কিতাবুল মাসাহেফ, ১২৮)
উপরোক্ত বিভিন্ন রিওয়ায়েত এ কথা প্রমাণিত হল যে, কিছু সংখ্যক উলামায়ে কেরাম যারা নামাযে দেখে দেখে কুর’আন পড়ার প্রবক্তা তারাও দেখে পড়ার জন্যে “হালতে ইজতেরার” অনোন্যপায় অবস্থা কে শর্তযুক্ত করেছেন। হালতে ইজতেরার কী? কখন পাওয়া যাবে এই অবস্থা? আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ পাকের অশেষ মেহেরবানিতে এখনও এই অবস্থার অবতারণা হয়নি যে, খুঁজলে বা ত্বলব থাকলে নামাযে মুখস্থ কিরাত পড়ার যোগ্য ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ কুর’আন মুখস্থ করার সাথেই কুর’আন মাজীদের অবশিষ্ট থাকা।
কুর’আন মাজীদ যেন মাহফুজ আর সংরক্ষিত থাকে এজন্যেই নামাযে মুখস্থ কিরাতের বিধান দেওয়া হয়েছে। যাতে করে আল্লাহর বান্দারা তার কালাম বেশি বেশি মুখস্থ করে। এব্যাপারে শায়খ নাসিরুদ্দিন আলবানীর বক্তব্য বেশ লক্ষণীয়। তিনি বলেন, ” যাকওয়ানের ইমামতির ঘটনা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এর উপর ভিত্তি করে ব্যাপকভাবে অনুমতি দেওয়া যায় না। যদি মসজিদের ইমামদেরকে অনুমতি দেয়া হয় তবে কুর’আন হিফজ বা সংরক্ষণের যাবতীয় কার্যক্রম আস্তে আস্তে নিষ্প্রভ হয়ে যাবে। অথচ এটা নবী করীম সা. এর ইরশাদের বিপরীত। কেননা নবী করীম সা. ইরশাদ করেন, তোমরা কুর’আন সংরক্ষণ কর। ঐ জাতের কসম যার আয়ত্বে আমার জান, নিশ্চয় কুর’আন কারীম বিদায়ের ক্ষেত্রে ও লোকদের সীনা থেকে বের হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে উট তার বাঁধন থেকে পলায়ন করা থেকেও বেশি দ্রুততর। আর একথাও সবার জানা যে, অসীলার বিধান আর মূল বস্তুর বিধান একই। উলামায়ে কেরাম বলেন, যেই অসীলার মাধ্যমে ওয়াজিব অবিশিষ্ট থাকে বা স্থাপিত হয় তাও ওয়াজিবের অন্তর্ভুক্ত। আর যেই বস্তু কোন মসিবত বা গুনাহের মাধ্যম হয় সে কাজটাও গুনাহ। ( ফাতহুর রাহমান, ১২৪-১২৫)
সারকথা..
উপরিউক্ত আলোচনায় বুঝা গেল, নামাযে মোবাইলে বা কুর’আন শরীফ ধারণ করত দেখে দেখে পড়ার অনুমতি নেই। এর পক্ষে কোন মারফু’ হাদীসের দলীল নেই। উপরোন্তু এতে আমলে কাছীর হয় যা নামাযের বিপরীত বিষয়। আর মাসহাফ বা মোবাইল ধারণ না করে শুধুমাত্র দেখে দেখে নামাযে কিরাত পড়ার সম্পর্কেও কোন মারফু’ হাদীসের দলীল নেই। সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীদের কিছু রিওয়ায়েত যা পাওয়া যায় সেগুলোর উপর আমল করা একাধিক মারফু’ হাদীসের মুকাবেলায় পরিত্যাজ্য। সবশেষে ইমাম ইবনে হাযম রাহ. এর একটি ফাতাওয়া উল্লেখ করে লেখা শেষ করছি।
ولا یحل لأحد أن یوٴم وهو ینظر ما یقرأ به في المصحف لا في فریضة ولا نافلة، فإن فعل عالما بأن ذلک لایجوز بطلت صلاته وصلاة من ائتم به عالما بحاله وعالما بأن ذلک لا یجوز” (المحلي- )
” কোন এরূপ ব্যক্তির পক্ষে ইমামতি করা জায়েয নেই যে নামাযে কুরআন মাজীদ দেখে দেখে কিরাত পড়ে। ফরজ নামাযেও নয়, নফল নামাযেও নয়। নাজায়িয জানা সত্বেও যদি কেউ এরূপ করে তবে তার নামায বাতিল হয়ে যাবে এবং যারা তার পিছনে ইকতেদা করবে তাদের নামাযও নষ্ট হয়ে যাবে যদি মুক্তাদিরাও এ মাসয়ালা সম্পর্কে অবগত থাকে।”    (দেখুনঃ আল মুহাল্লা, ৩য় খণ্ড, ১৪০ পৃষ্ঠা

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

সালমুন আমিন আয়ান এর জন্য পছন্দনীয় ময়মনসিংহ বিভাগের মাদ্রাসার তালিকা কওমি ও আলিয়া

@R- সমস্যার সমাধান@

কখন কী বলা সুন্নাত